
বাংলাদেশে
বাজেট ঐতিহ্যগতভাবে নমিনাল টার্মে ইনক্রিমেন্টাল পদ্ধতিতে প্রণীত হয়।
নমিনাল টার্মে প্রতিবছর বাজেটের আকার বৃদ্ধি পায়। জিডিপি এবং মূল্যস্ফীতির
প্রবৃদ্ধি যোগ করে যা হয়, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই বাজেটের ইনক্রিমেন্ট
ধরা হয়। কারণ এটা না ধরলে দেখা যাবে রিয়াল টার্মে আসলে আকার বাড়েনি কিংবা
অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়নি। যেখানে ছিলাম, যেন সেখানেই রয়ে গেছি। তাছাড়া বাজার
প্রভাবিত (market dominated) কিংবা কল্যাণমুখী (welfare oriented) উভয়
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ভোক্তা বা জনকল্যাণে কতদূর অগ্রসর হওয়া গেছে তা
বোঝানোর জন্য বাজেটের আকার বাড়ানোর রেওয়াজ রয়েছে। গত বছরের ৩ লাখ ৪০ হাজার
৬০৫ কোটি টাকার জায়গায় এবার ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট দেয়া হয়েছে,
প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশ। এবারের প্রবৃদ্ধিটা তুলনামূলকভাবে অতীতের চেয়ে বেশি
ধরা হয়েছে। আমাদের বিনিয়োগ কম অথচ অর্থনীতি প্রসারিত হচ্ছে, তাই অধিক
বিনিয়োগের জন্যও বাজেট বড় হতে হয়। তবে এই বড় বাজেট তখনই উচ্চাভিলাষী বলে
সমালোচনার যোগ্য হয়, যখন দেখা যায় বাজেট বড় ধরা হলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন
হয় না। বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যে বিচ্যুতি, যে
অপব্যয়, রাজস্ব আহরণে যে অপ্রাকরণিক চাপ সৃষ্টি হয় সেটিই সমালোচনার বিষয়
হয়ে দাঁড়ায়। জাতীয় বাজেটে ব্যয়ের প্রাক্কলন আগে করা হয়। ওই অনুযায়ী
অভ্যন্তরীণ সম্পদ জোগানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। ব্যয় বাজেটের পুরোপুরি
বাস্তবায়ন করা না গেলে বাজেট বাস্তবায়নোত্তর যেসব উন্নয়নসূচক প্রত্যাশা করা
হয়েছিল, তা আসবে না। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এবং আগামী অর্থবছরের এডিপিতে
দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমিয়ে যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি খাতে অস্বাভাবিক পরিমাণ বরাদ্দের সমাহার ঘটানো হয়েছে।
গুণগতমান
বজায় রেখে স্বচ্ছতার সঙ্গে এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণে অর্থব্যয়ের
ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। রাজস্ব আয়ের
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাজস্ব আয়ের যে
লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে তা অবশ্যই অর্জনযোগ্য হতে হবে। কেননা এই আয়ের ওপরই
ব্যয় বাস্তবায়ন নির্ভরশীল। এর আরও একটি ব্যাখ্যা আছে। এডিপির মাধ্যমে
সরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উভয়ই অর্থনীতির জন্য আয়। অর্থাৎ
বিনিয়োগ ব্যয়ই অর্থনীতির আয়। সরকারি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হলে
অর্থনীতির আয়ও হবে না। অর্থনীতির আয় না হলে রাজস্ব অর্জন হবে না। ১০০ টাকার
এডিপি বাস্তবায়ন করলে সরকার গড়ে ৩০ টাকার মতো রাজস্ব পায়। অর্থাৎ এডিপি
বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব আয়ও হয়। তাই এডিপি বাস্তবায়ন না করা গেলে বা
যথাযথভাবে ব্যয়িত না হলে রাজস্ব আয় হবে না। এটা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
রাজস্ব আয় করা গেলে এডিপি বাস্তবায়ন সহজ হবে, এটা যেমন সত্যি, তেমনি এডিপি
বাস্তবায়ন না হলে রাজস্ব আয়ও হবে না। সুতরাং আয়-ব্যয় দুই ক্ষেত্রেই
বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত কাক্সিক্ষত (জিডিপির
১৬/১৭ ভাগ) পর্যায়ে পৌঁছানো অবধি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় করার মধ্যে
যুক্তি আছে, তবে দেখতে হবে সেটা অর্জন করার উপযুক্ত পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি
নেয়া হয়েছে কিনা। গত ২-৩ বছরে দেখা গেছে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২-১৩ শতাংশের
বেশি হচ্ছে না (চলতি বছরে এ হার কয়েক শতাংশ বাড়তে পারে), সেখানে
লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ৩৪ শতাংশের বেশি। এটা বিশাল একটা
ব্যবধান। যদি রাজস্ব বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে ঠিক আছে। উপযুক্ত পথ-পন্থা নিয়ে
অগ্রসর না হলে রাজস্ব আহরণ-আয় পরিস্থিতিতে টানাপোড়েন তৈরি হবে। বাজেটের
ফিগার বা টার্গেট নিয়ে তর্ক-বিতর্কের চেয়ে ওই টার্গেট পূরণে কতটা
যুক্তিযুক্ত ও কার্যকর কর্মসূচি নেয়া হয়েছে সে দিকে নজর দেয়া জরুরি। যেমন
এবার বলা হচ্ছে ভ্যাটের আওতা ও হার বাড়বে। এর ফলে গত দু’বছর আয়কর
প্রাধান্যে আসার পথে থাকলেও এবার ভ্যাট আবার সে জায়গায় নিতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে আয়করের লক্ষ্যমাত্রা ৮৫ হাজার কোটি টাকা, ভ্যাটের
লক্ষ্যমাত্রা সেখানে ৯১ হাজার কোটি টাকা। এটি সামষ্টিক অর্থনীতি
ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য পরিস্থিতি নির্দেশ করে। বর্ধিত ভ্যাট আহরণের জন্য
প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। প্রকৃত প্রস্তাবে বাজেটে আগের
ভ্যাট আইন ও নতুন আইনের মিশ্রণ ঘোষণা করা হয়েছে। আগের আইনে যা কিছু ছিল,
সেখান থেকে কোনটা কেন রাখা হল তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। করের আপাতন কোথায় বাড়ল
কিংবা কোথায় কমল, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
অথচ মূল্যস্ফীতিতে অগোছালো কর
আপাতনের প্রভাব অবশ্যই পড়বে। শুধু কর কাঠামোর কারণেই নয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের
দাম বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্তের
ওপর চাপ তৈরি হবে। এটা প্রণিধানযোগ্য যে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার প্রভাব
পড়বে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর। সামগ্রিকভাবে বাজেটে যে আয় ও ব্যয় ধরা হয়েছে,
তা বাস্তবায়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অবর্তমানে শুধু প্রশাসনিক
ব্যবস্থাপনা দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিনতর। বাজেট সফলভাবে
বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করার যৌক্তিকতা সত্ত্বেও বাজেট প্রণয়ন ও
বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা না থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন গজেন্দ্রগামী
হয়ে পড়বে। আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ সহায়তা
ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা (৫৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি) ধরা হয়েছে, যা অবাস্তব মনে হতে
পারে এ জন্য, গত চার বছর মিলেও এ পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহৃত হয়নি।
সাধারণত বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা দেয়া থাকে তার সঙ্গে অর্জনের বড় ধরনের
পার্থক্য দেখা গেলে সে বাজেটকে পরাবাস্তব কাঠামো বলা হয়। গত ১০ বছরের তথ্য
পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেষ মাসে ২২ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। এটি
কীভাবে সম্ভব এবং কেন শেষ মাসে সব অর্থছাড় হবে? শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি
বাড়লেই অর্থনীতি উন্নয়নের সড়কে আছে বলা যায় না, কেননা প্রবৃদ্ধি দিয়ে
বেকারত্ব দূর না হলে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে, গুণগত ব্যয়ে সম্পদ ও সেবা
সৃষ্টি না হলে তা তাৎপর্যপূর্ণ বা পুষ্টিকর হবে না। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও
কর্মসংস্থান বাড়ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। শিল্প
খাতে নারীদের কর্মসংস্থান কমে গেছে। কর্মসংস্থান যে পদ্ধতিতে গণনা করা
হচ্ছে, তা সঠিক কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রস্তাবিত বাজেটে আসন্ন
অর্থবছরে প্রকৃত মজুরি হ্রাসের ফলে সৃষ্ট ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ,
প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা, প্রকৃত খাতগুলোর প্রবৃদ্ধিতে মন্থরগতি ও সামাজিক
খাতে ব্যয় হ্রাসের সংকট মোকাবেলার জন্য সুুস্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি
পরিলক্ষিত হয়েছে। এগুলো বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান কর কাঠামো অপ্রগতিশীল এবং সংকীর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে,
যদি কর
পরিহার ও কর ফাঁকি নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়। এতে বণ্টনমূলক ন্যায্যতার অভাব
ফুটে উঠবে এবং তা আয়বৈষম্য বাড়াবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৬
কোটি টাকার ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি
টাকা, বৈদেশিক ঋণ থেকে ৪৫ হাজার ৪২০ কোটি ও অনুদান থেকে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি
টাকা সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে, যার প্রভাবে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ হ্রাস পেতে
পারে ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য
বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ দূর করা ছাড়া সাধারণ জনগণের করের টাকায়
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া অব্যাহত থাকলে এ
খাতে আর্থিক লুট ও কেলেঙ্কারি আস্থাহীনতার দ্যোতক হিসেবে প্রকাশ পাবে।
বিশাল অনুন্নয়ন ও প্রকল্প ব্যয়ে অর্থের জোগান দিতে গিয়ে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ
করের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়ে জীবনযাত্রার মান
নিন্মমুখী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হবে। সরকারি বরাদ্দ কম থাকার ফলে স্বাস্থ্য
খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে এ খাতের উন্নয়নে
বরাদ্দের আকার মোট উন্নয়ন ব্যয়ের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, সেখানে আগামী
অর্থবছরের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ৬ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি
সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতেও উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমেই
কমছে। প্রকৃত খাতগুলোর মধ্যে কৃষি ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি মন্থর থাকা
সত্ত্বেও মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির যে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখানো হয়েছে, তা
সঙ্গতিহীন ও প্রশ্নসাপেক্ষ। এ ছাড়া এ প্রবৃদ্ধির সুফল জনগণের মধ্যে
সমবণ্টিত নয়। এ কারণে ২০১০-১১ সাল থেকে প্রকৃত মজুরি ক্রমশ কমেছে।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক






Post a Comment